Saturday, October 12, 2013

হুমকির মুখে সুন্দরবন

মোহাম্মদ আব্দুর রহীম : অবশেষে ভারত আমাদের ঐতিহ্যবাহী সুন্দরবনকে ধ্বংসের পাঁয়তারায় মেতে উঠেছে। ভারত চায় বাংলাদেশের অথনৈতিক সম্পদ ধ্বংস করে দিয়ে এ দেশটাকে তাদের করদরাজ্যে পরিণত করতে। বাঘ আমাদের অনন্য প্রতীক। পৃথিবীর বিস্ময় এই বেঙ্গল টাইগারের একমাত্র আবাসস্থল আমাদের সুন্দরবন। এই বন প্রাণ-প্রকৃতির এক অনন্য আধার। হাজার প্রজাতির জীব বৈচিত্র্যের সম্মেলনে গড়ে ওঠা সুন্দরবন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। পৃথিবী জুড়ে প্রকৃতির সাথে মানুষের সহাবস্থানের নিত্য নতুন উপায় যখন উদ্ভাবিত হচ্ছে ঠিক তখনই সুন্দরবনের অস্তিত্ব নিশ্চিত হুমকিতে ফেলে ভারতের স্বার্থে বাংলাদেশ করতে যাচ্ছে ১৩২০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিশাল রামপাল প্রকল্প।
পৃথিবীতে প্রচলিত জ্বালানিগুলোর মাঝে সবচেয়ে নিকৃষ্ট হচ্ছে কয়লা। একশ বছর ধরে চলে আসা কয়লা ব্যবহারের ক্রমাগত দূষণে পৃথিবী জুড়ে ঝড়-জলোচ্ছাস-খরা, সুনামি-ক্যাট্রিনা-সিডর-আইলা এখন নিত্যসঙ্গী। বাংলাদেশে সিডর-আইলা’র রেখে যাওয়া ক্ষত এখনও আমরা বয়ে বেড়াচ্ছি। এই সিডর-আইলা’র ক্ষতি নিশ্চিতভাবেই কল্পনার সীমাকেও হার মানাত যদি না সুন্দরবন বুক চিতিয়ে প্রাকৃতিক উন্মত্ততার বাধা হয়ে না দাঁড়াত। দক্ষিণাঞ্চলীয় এই ‘সুন্দরবনী’য় বাধা না থাকলে ধ্বংসলীলা চলত বাংলাদেশের দক্ষিণ প্রান্ত হতে উত্তর প্রান্ত পর্যন্ত। এই সুন্দরবন শুধু আমাদের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচই নয়। এটি ৬ লাখ মানুষের জীবন ও জীবিকার একমাত্র অবলম্বন। অথচ সুন্দরবনের এতসব উপযোগিতা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নিত্য পরিবেশ দূষণে সুন্দরবনের ক্রমাগত ক্ষতির কোন প্রতিকার না করে, আমাদের চোখে উন্নয়নের ঠুলি পরিয়ে সুন্দরবন থেকে মাত্র নয় কিলোমিটার দূরে রামপালে হতে যাচ্ছে বিশালাকার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র।
ইতোমধ্যেই রামপাল এলাকার প্রায় ৪০০০ পরিবারকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে ১৮৩৪ একর জায়গা অধিগ্রহণ করে মাটি ভরাটের কাজ শুরু করে দেয়া হয়েছে। দীর্ঘ দুই বছর ধরে প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, কোম্পানী গঠন আর জমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ করে বেআইনীভাবে লোক দেখানো পরিবেশগত সমীক্ষা রিপোর্ট (ইআইএ) প্রকাশ করা হয় এ বছরের শুরুর দিকে। এই ইআইএ রিপোর্টে সুন্দরবনের পরিবেশ-প্রতিবেশ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে যেনতেন ভাবে প্রকল্পটি করে ফেলার পক্ষে ওকালতি করার চেষ্টা প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে।
রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পে ভারত হয়েছে বাংলাদেশের ব্যবসায়িক অংশীদার। চুক্তিনামা অনুসারে বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ বিনিয়োগ হবে ৩০ শতাংশ। বাকি ৭০ শতাংশ ভারতেরই কোন ব্যাংক হতে বাংলাদেশ উচ্চসুদে ঋণ করার এ প্রকল্পে ভারতীয় সব কোম্পানী মূলধনী যন্ত্রপাতির ব্যবসা করবে। ভারত এ প্রকল্প ব্যবসায় কর অবকাশ সুবিধাও পাবে। আবার উৎপাদিত বিদ্যুৎ ভারতীয় কর্তৃপক্ষের ধার্য করা হারেই বাংলাদেশকে কিনতে হবে। অর্থাৎ মাত্র ১৫ শতাংশ বিনিয়োগে রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পে বাংলাদেশের মাটিতে ভারতীয় আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠিত হবে। অন্যদিকে ক্ষয়ক্ষতির সকল দায়ভার বহন করতে হবে বাংলাদেশকেই। অথচ চুক্তি অনুসারে এ ব্যবসার মুনাফা উভয়ের মাঝে সমান দুই ভাগে ভাগ হবে।
সুন্দরবন থেকে প্রকল্প স্থানের দূরত্ব বাস্তবে মাত্র ৯ কিলোমিটার হলেও সরকারিভাবে এই দূরত্ব ১৪ কিলোমিটার বলে প্রচার করা হচ্ছে। যদিও ভারতেরই ইআইএ গাইডলাইন অনুসারে জীব-বৈচিত্র্যের গুরুত্ব সম্পন্ন কোন এলাকার আশেপাশে ২৫ কিলোমিটার এর মধ্যে কোন বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন নিষিদ্ধ। অর্থাৎ যে ভারত নিজের দেশের আইন অনুসারে প্রাণ-পরিবেশ ধ্বংসকারী এমন প্রকল্পের কথা চিন্তাও করতে পারত না- সে ভারতই বাংলাদেশকে চরম সংকটে ফেলে ব্যবসায়িক সহযোগী সেজে চলে এসেছে রামপাল প্রকল্পের লাভের গুড় খেতে।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত হয় প্রায় ৩০ বছর আগে। সেখানে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্রমাগত দূষণে ছাইয়ের আস্তরণে ঢাকা পড়ে আর এসিড বৃষ্টির প্রকটতায় ৪৮ কিলোমিটার জুড়ে হাজার হাজার ওক, পেকান, এলম গাছ ইতোমধ্যেই মরে গেছে। এই যদি হয় যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দূষণে কৃত্রিম বাগানের গাছ গাছালির করুণ অবস্থা-তবে রামপাল প্রকল্পের দূষণে মাত্র ৯ কিলোমিটার দূরে থাকা নিবিড় সুন্দরবন যে পরবর্তী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যেই হারিয়ে যাবে বলে বিশেষজ্ঞগণ আশংকা প্রকাশ করছেন, তা মোটেই অত্যুক্তি নয়।
যে কোন প্রকল্পে প্রযুক্তি ব্যবহার করে দূষণ রোধ করার কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত সেটি কথার কথাই থেকে যায়। কেননা মুনাফার বাজারে প্রযুক্তি ব্যবহারের বাড়তি ব্যয় ধোপে টেকে না, আর দূষণ নিরোধক যন্ত্রপাতির আয়োজনে উৎপাদন শেষ পর্যন্ত সুলভ হয় না। তাই রামপালের ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র হতে প্রতিদিন ছড়িয়ে পড়া ১৪২ টন বিষাক্ত সালফার ডাই অক্সাইড, ৮৫ টন নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড, ২ হাজার ৬০০ টন ছাই যে সুন্দরবনের নিশ্চিত মৃত্যু ডেকে নিয়ে আসবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
যদি অতি মাত্রায় আশাবাদী হয়ে ধরেও নেই যে, এ প্রকল্পে অত্যন্ত ব্যয়বহুল দূষণ নিরোধক ব্যবস্থা নেয়া হবে, জবাবদিহিতার সংস্কৃতি রামপাল প্রকল্প দিয়েই আমাদের দেশে শুরু হবে কিন্তু তারপরও এ কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় ৪৭ লক্ষ টন কয়লা তো সুন্দরবনের গভীরতম অংশের মধ্য দিয়েই পরিবহন করা হবে। লক্ষ টনী বাল্ক ক্যারিয়ার আর হাজার টনী লাইটারেজ জাহাজের সারা বছরব্যাপী আনাগোনা, তীব্র শব্দ, জাহাজ হতে চুইয়ে পড়া তেল, কয়লার ভাংগা টুকরা, জাহাজ চলাচলের প্রচ- ঢেউ যে সুন্দরবনের ইকোসিস্টেমে ধ্বংসাত্মক পরিণতি ডেকে নিয়ে আসবে এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।
উন্নয়নের নামে সুন্দরবন হত্যার ধ্বংসাত্মক এ আয়োজনের প্রথম শিকার হয়েছেন সাপমারী কাটাখালী,  কৈগরদাসকাটি, কাপাসডাংগা, বাশেরহুলা মৌজাসহ রামপালের ৪ হাজার পরিবার। জোরপূর্বক তাদেরকে ভিটা মাটি ছাড়া করা হয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাবে কেড়ে নেয়া হয়েছে গোয়ালের গরু আর জমির ধান। এই ১৮৩৪ একর জায়গা জুড়ে বছর প্রতি যে ১৩০০ টন ধান আর ৬০০ মেট্রিক টন মাছের উৎপাদন ছিল-তা ইতোমধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে। সর্বনাশা এই প্রকল্পে হাজার জীবনের সাজানো সংসার নষ্ট হয়ে গেছে। এখন তারা উদ্বাস্তু। তাদের কেউ কেউ দিনমজুরি করে অতি কষ্টে দিনাতিপাত করছে আবার কেউবা শহরমুখী হয়ে বস্তির জীবন বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে।
রামপাল প্রকল্প যে সুন্দরবনের নিশ্চিত ধ্বংস নিয়ে আসছে এ ব্যাপারে সচেতন বিশেষজ্ঞ মহল শতভাগ নিশ্চিত। বিভিন্ন ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, সভা-সেমিনার’এ তা প্রতিনিয়ত তুলে ধরা হচ্ছে। কিন্তু শাসক শ্রেণীর কুম্ভকর্ণের ঘুম যেন ভাংছেই না। সময়ে সময়ে তাদের কাছে থেকে আমরা শুধু পাচ্ছি সুন্দরবন রক্ষার ‘গায়েবী’ আশ্বাস। অথচ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রকল্পের প্রারম্ভিক কাজ শুরু হয়ে গেছে পুরোদমে।
রামপাল প্রকল্প নিয়ে শাসকগোষ্টী সুন্দরবনকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের শেষ বিকল্প হিসেবে জাহির করার চেষ্টা করছেন। ভাবটা এমন যে, দেশের উন্নয়নে ‘সুন্দরবনীয়’ বিদ্যুৎই লাগবে। অথচ আমরা জানি আধুনিককালে সীমিত সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারে সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ উৎপাদনের হাজারটা উপায় আছে। কিন্তু হাজার বছরের বিবর্তনে গড়ে ওঠা আমাদের সুন্দরবন পৃথিবীতে একটিই। রামপাল প্রকল্প সেই সুন্দরবন ধ্বংসের নিশ্চিত আয়োজন সম্পন্ন করছে। ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের ৩ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের কাড্ডালোর কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে পিচাভারম নামের ছোট্ট ম্যানগ্রোভ বনটির দূরত্ব আট কিলোমিটার। ভারতের তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন-সংক্রান্ত আইন ১৯৮৭ অনুসারে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ২৫ কিলোমিটার সীমার মধ্যে কোনো বনভূমি থাকা চলবে না। ফলে তামিলনাড়ুর সরকার ২০১০ সালে কাড্ডালোর কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিবেশ ছাড়পত্র দিলেও ২০১২ সালের ২৩ মে সে ছাড়পত্র স্থগিত করে দিয়েছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের গ্রিন ট্রাইব্যুনাল। ভারতীয় হিন্দু পত্রিকার রিপোর্টে এ বিষয়ে বলা হয়েছে,
পিচাভারমের আয়তন ১১ বর্গকিলোমিটার, যা ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের সুন্দরবনের মাত্র ৯০০ ভাগের এক ভাগ। ভারতে ছোট্ট একটি ম্যানগ্রোভ বনের পাশে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন না-জায়েজ হলেও বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনের পাশে বাংলাদেশে ভারতীয় কোম্পানিরই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন জায়েজ!
একইভাবে কর্ণাটক রাজ্যে অবস্থিত রাজীব গান্ধী ন্যাশনাল পার্কের ২০ কিলোমিটারের মধ্যে চামালাপুর গ্রামে ১ হাজার মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করতে পারেনি ভারত ২০০৮ সালে। রাজীব গান্ধী ন্যাশনাল পার্কের বিস্তৃতি ৬৪৩ বর্গকিলোমিটারজুড়ে, যা সুন্দরবনের আয়তনের ১৬ ভাগের এক ভাগ। যে ভারত তার নিজ দেশে সুন্দরবনের ১৬ ভাগের এক ভাগ আয়তনের রাজীব গান্ধী ন্যাশনাল পার্ক এবং ৯০০ ভাগের এক ভাগ আয়তনের পিচাভারম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের ২৫ কিলোমিটার সীমার মধ্যে তাপভিত্তিক কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে পারেনি, সেই ভারত বাংলাদেশে সুন্দরবনের মতো একটি বিশ্ব ঐতিহ্য, জীববৈচিত্র্যের অফুরন্ত আধার, রামসার সাইট ও ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ বলে ঘোষিত পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের মাত্র ১৪ কিলোমিটারের মধ্যে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের একটি বিশাল তাপভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে যাচ্ছে! ভারতের সীমানার ভেতরের বনাঞ্চল সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাংলাদেশের অস্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত সুন্দরবনের অংশের যেন কোনো গুরুত্ব নেই। বাংলাদেশের সুন্দরবন একটি এতিম বনাঞ্চল, যার পাশে দাঁড়ানোর কেউ নেই!
অথচ শুধু গোলপাতা, কাঠ, মোম, মধু, মাছ, সারি সারি গাছ আর নদ-নদী-খালের সজীব আধারই নয়, সুন্দরবন যেন গোটা বাংলাদেশকেই লালন করছে, আগলে রাখছে। একদিকে বনের গাঢ় সবুজের সমারোহ সাগরের ওপর থেকে মেঘ টেনে আনে স্থলভাগে এবং শিকড়ের জাল পেতে নদীবাহিত পলি ধরে রাখে, অন্যদিকে যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে বুক পেতে রক্ষা করে গোটা উপকূল। সেই সুন্দরবন, সেই সজীব প্রাণের স্পন্দনে ভরা প্রিয় বাদাবন নিজেই এবার বিপদে পড়েছে। কঠিন বিপদ। গাছপালা-পশুপাখি-মানুষসহ যে জগতটাকে সে এত দিন আগলে রেখেছে, সেই গোটা জগতের অস্তিত্বই আজ হুমকির মুখোমুখি। এমনিতেই প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট নানা দুর্বিপাকে সুন্দরবনের অস্তিত্ব বিপন্ন, তার ওপর এখন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে যুক্ত হয়েছে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের ওই বিশাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প। গত এপ্রিলে ভারতীয় কোম্পানি এনটিপিসির সঙ্গে প্রয়োজনীয় চুক্তিও হয়ে গেছে। এর আগে স্থানীয় জনগণের প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও এমনকি পরিবেশ সমীক্ষা ছাড়াই ১ হাজার ৮৩৪ একর জমি অধিগ্রহণ করে মাটি ভরাটের কাজ শুরু হয়েছিল। সম্প্রতি বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদদের আপত্তি উপেক্ষা করে বিতর্কিত পরিবেশ সমীক্ষারও অনুমোদন হয়ে গেছে। সরকার জনগণের মধ্যে ভীতি তৈরি, রাষ্ট্রের পেশি শক্তি প্রদর্শন, দেশের বিশেষজ্ঞদের মতামত, স্থানীয় জনগণ এমনকি সরকারের বিভিন্ন বিভাগ যেমন বন বিভাগ, নৌ মন্ত্রণালয়, পরিবেশ মন্ত্রণালয় ইত্যাদির বিরোধিতা অগ্রাহ্য করে ভারতীয় কোম্পানির মুনাফার স্বার্থে সামরিক বাহিনীর সাবসিডিয়ারি বাংলাদেশ ডিজেল পাওয়ার প্ল্যান্ট লিমিটেডকে দিয়ে প্রকল্পের মাটি ভরাটের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
রামপালে প্রস্তাবিত কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করা হলে সুন্দরবন যেসব বিপর্যয়ের শিকার হবে তার কয়েকটি নমুনা :
১. কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রতিদিন ১৪২ টন বিষাক্ত সালফার ডাই-অক্সাইড ও ৮৫ টন বিষাক্ত নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড নির্গত হবে। ফলে পরিবেশ আইনে বেঁধে দেয়া পরিবেশগত স্পর্শকাতর এলাকাসীমার (প্রতি ঘনমিটারে ৩০ মাইক্রোগ্রাম) তুলনায় এসব বিষাক্ত গ্যাসের মাত্রা অনেক বেশি হবে (প্রতি ঘনমিটারে ৫৩ মাইক্রোগ্রামের বেশি)। ফলে এসিড বৃষ্টি, শ্বাসতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতিসহ গাছপালা-জীবজন্তুর জীবন বিপন্ন হবে। অথচ জালিয়াতি করে সুন্দরবনকে পরিবেশগত স্পর্শকাতর এলাকার বদলে ‘আবাসিক ও গ্রাম্য এলাকা’ হিসেবে দেখিয়ে বিষাক্ত গ্যাসের পরিমাণ নিরাপদ মাত্রার মধ্যেই থাকবে বলে প্রতারণা করা হচ্ছে।
সুন্দরবনের পাশে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে যেমন ১৪ কিলোমিটার দূরত্বের কথা বলে আশ্বস্ত করার চেষ্টা চলছে, যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ফায়েত্তি কাউন্টিতে ১৯৭৯-৮০ সালে ১ হাজার ২৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সময়ও স্থানীয় মানুষকে এভাবে আশ্বস্ত করা হয়েছিল। এমনকি কিছুদিন পরে এর ক্ষমতা বাড়িয়ে ১ হাজার ৬৯০ মেগাওয়াটে উন্নীত করা হয়। ফলাফল সঙ্গে সঙ্গে বোঝা না গেলেও ৬৬ থেকে ১৩০ ফুট উঁচু বিশালাকৃতির পেকান গাছগুলো (এক ধরনের শক্ত বাদাম, কাজু বাদামের মতো) যখন একে একে মরতে শুরু করল, ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ১৯৮০ থেকে ২০১০ সালের হিসাবে ফায়েত্তি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নিঃসৃত বিষাক্ত গ্যাস বিশেষত সালফার ডাই-অক্সাইডের বিষক্রিয়ায় পেকান, এলম, ওকসহ বিভিন্ন জাতের গাছ আক্রান্ত হয়েছে, বহু পেকান বাগান ধ্বংস হয়েছে, অন্তত ১৫ হাজার বিশালাকৃতির পেকান গাছ মরে গেছে এবং এই ক্ষতিকর প্রভাব কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে এমনকি ৪৮ কিলোমিটার দূরেও পৌঁছে গেছে।
ফায়েত্তি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বছরে গড়ে ৩০ হাজার টন সালফার ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের ফলে সালফার ও এসিড দূষণে হাইওয়ে ২১-এর ৪৮ কিলোমিটারজুড়ে গাছপালার এই অবস্থা যদি হতে পারে, তাহলে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সরকারি হিসেবেই দৈনিক ১৪২ টন হারে বছরে প্রায় ৫২ হাজার টন (ফ্লু গ্যাস ডিসালফারাইজার বা এফজিডি ব্যবহার না করার কারণে দূষণ অপেক্ষাকৃত বেশি) সালফার ডাই-অক্সাইড নিঃসৃত হলে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সুন্দরবনের কী অবস্থা হবে তা ভেবে আতঙ্কিত হতে হয়।
২. সাড়ে চার বছর ধরে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকালে পণ্য ও যন্ত্রপাতি সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে নদীপথে পরিবহনের সময় বাড়তি নৌযান চলাচল, তেল নিঃসরণ, শব্দদূষণ, আলো, বর্জ্য নিঃসরণ, ড্রেজিং ইত্যাদির মাধ্যমে সুন্দরবনের ইকোসিস্টেম বিশেষ করে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হরিণ, ডলফিন, ম্যানগ্রোভ বন ইত্যাদির ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে।
৩. কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রে বছরে ৪৭ লাখ ২০ হাজার টন কয়লা পুড়িয়ে ৭ লাখ ৫০ হাজার টন ফ্লাই আশ ও ২ লাখ টন বটম আশ উৎপাদিত হবে। এ ফ্লাই আশ, বটম আশ, তরল ঘনীভূত ছাই বা স্লারি ইত্যাদি ব্যাপক মাত্রায় পরিবেশ দূষণ করে। কারণ এতে বিভিন্ন ভারী ধাতু যেমন আর্সেনিক, পারদ, সিসা, নিকেল, ভ্যানাডিয়াম, বেরিলিয়াম, ব্যারিয়াম, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, সেলেনিয়াম, রেডিয়াম মিশে থাকে। এ দূষণকারী ছাই দিয়ে ১ হাজার ৪১৪ একর জমি ৬ মিটার উঁচু করা হবে। ফলে এ ছাই উড়ে, ছাই ধোয়া পানি চুইয়ে আশপাশের নদী-খাল ও ভূগর্ভস্থ জলাধার দূষিত হবে।
৪. কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের টারবাইন, জেনারেটর, কমপ্রেসার, পাম্প, কুলিং টাওয়ার, কয়লা ওঠানামা, পরিবহন ইত্যাদি কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ও যানবাহন থেকে ভয়াবহ শব্দদূষণ হয়। বলা হয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রের চারপাশে সবুজ বেষ্টনী তৈরি করে সুন্দরবনকে রক্ষা করা হবে। কিন্তু সবুজ বেষ্টনী বেড়ে উঠতে তো সময় লাগবে। ওই কয় বছর শব্দদূষণ প্রতিহত করা হবে কীভাবে কিংবা সবুজ বেষ্টনীর বাইরে যন্ত্রপাতি ও পণ্য পরিবহন, ড্রেজিং ইত্যাদি কাজের সময় যে শব্দদূষণ হবে, তার ক্ষতিকর প্রভাব কীভাবে মোকাবিলা করা হবে।
৫. প্ল্যান্ট পরিচালনার জন্য পশুর নদী থেকে ঘণ্টায় ৯ হাজার ১৫০ ঘনমিটার পানি সংগ্রহ করা হবে এবং পরিশোধন করার পর পানি এ নদীতে ঘণ্টায় ৫ হাজার ১৫০ ঘনমিটার হারে নির্গমন করা হবে। পরিশোধনের কথা বলা হলেও বাস্তবে এর পরও পানিতে নানা রাসায়নিক পদার্থ ও অন্যান্য দূষিত উপাদান থেকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকেই। তাছাড়া নদী থেকে এ হারে পানি প্রত্যাহার, তারপর বিপুল বেগে পানি আবার নদীতে নির্গমন, নির্গমনকৃত পানির তাপমাত্রা ইত্যাদি এর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ, পানির প্লাবতা, পলিবহন ক্ষমতা, মৎস্য ও অন্যান্য প্রাণী ও উদ্ভিদের জীবন চক্র ইত্যাদির ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবেই; যা নদী-নালা, খাল-বিলের মাধ্যমে গোটা সুন্দরবনের জলজ বাস্তুসংস্থানের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে।
৬. কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের চিমনি থেকে নির্গত বিষাক্ত গ্যাসের তাপমাত্রা হবে ১২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা চারপাশের পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে।
৭. বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য আমদানি করা কয়লা সুন্দরবনের মধ্য দিয়েই পরিবহন করা হবে। এজন্য বছরে ৫৯ দিন বড় জাহাজ এবং ২৩৬ দিন লাইটারেজ জাহাজ সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে কয়লার মতো দূষণকারী কার্গো নিয়ে চলাচল করবে। ফলে কয়লা পরিবহন, ওঠানামা, জাহাজের ঢেউ, নাব্যতা রক্ষার জন্য ড্রেজিং, জাহাজ থেকে নির্গত তরল কঠিন বিষাক্ত বর্জ্য, জাহাজ নিঃসৃত তেল, দিন-রাত জাহাজ চলাচলের শব্দ, সার্চ লাইট ইত্যাদি সুন্দরবনের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও জীববৈচিত্র্য বিনাশ করবে। এগুলো আমাদের নিজেদের কথা নয়, প্রকল্পের কাজ শুরু করে দিয়ে তারপর এটি জায়েজ করার জন্য যে পরিবেশ সমীক্ষা করা হয়েছে, তাতে শত জালিয়াতি করেও এ রকম ভয়ঙ্কর ফলাফলকে ঢেকে রাখা যায়নি। বন অধিদফতর থেকে ২০১১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় বরাবর চিঠি দিয়ে জানানো হয়: ‘কয়লাভিত্তিক পাওয়ার প্লান্ট স্থাপন করা হলে সুন্দরবনের তথা সমগ্র সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন হবে। বাংলাদেশকে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষার বাধ্যবাধকতা আন্তর্জাতিকভাবেও আরো দায়িত্বশীল করে। খুলনা অঞ্চল সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় কয়লাভিত্তিক স্থাপন করা হলে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে অভিমত ব্যক্ত করেন বন সংরক্ষক। বিধায় কয়লাভিত্তিক  প্রকল্প গ্রহণের বিষয়টি জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে গুরুত্ব দিয়ে পুনর্বিবেচনা করার জন্য মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হলো।’
কিন্তু এত কিছুর পরও বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠীর কোনো ভ্রƒক্ষেপ নেই। স্থানীয় জনগণ, সারা দেশের জনমত, বিশেষজ্ঞ এমনকি রাষ্ট্রের আমলাতন্ত্রের মতামত পর্যন্ত উপেক্ষা করে তারা মরিয়া হয়ে উঠেছে ভারতীয় আধিপত্য বিস্তারের এ প্রকল্প বাস্তবায়নে। শুধু রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পই নয়, তিস্তার পানিবণ্টন, তিতাসের বুকে বাঁধ দিয়ে ভারতীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্রপাতি স্থানান্তর, টিপাইমুখ বাঁধ, ট্রানজিট, সীমান্ত হত্যা ইত্যাদি ক্ষেত্রে শাসকশ্রেণীর নতজানু অবস্থান খুব স্পষ্ট। ভারতের সরকারি-বেসরকারি বৃহৎ করপোরেশনের মুনাফা নজরে একদিকে ভারতেরই আদিবাসী, কৃষক ভূমি থেকে উচ্ছেদ ও প্রাণ-প্রকৃতি বিপন্ন হচ্ছে; অন্যদিকে বাংলাদেশের মতো প্রতিবেশী দেশের নদী, বনাঞ্চলও সাম্রাজ্যবাদের মুনাফা নজর থেকে মুক্ত নয়। ভারতীয় শাসকদের মুনাফা ও আধিপত্যের সম্প্রসারণে কখনো জুনিয়র পার্টনার, কখনো সাব-কন্ট্রাক্টজীবী কিংবা কমিশনভোগী হিসেবে বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠীর একটি শ্রেণীর এই নতজানু ভূমিকার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে ওঠা জরুরি। টিপাইমুখ বাঁধ প্রতিরোধে যেমন উত্তর-পূর্ব ভারতের আসাম-মণিপুরের জনগণের সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণের সংগ্রামের আন্তঃসংযোগ জরুরি, বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশজুড়ে থাকা এ সুন্দরবন ধ্বংসের রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্ষেত্রেও একইভাবে শুধু রামপাল বা বাংলাদেশের জনগণই নয়, ভারতীয় এমনকি সারা দুনিয়ার সংগ্রামী জনগণের পারস্পরিক সংগ্রামের আন্তঃসংযোগ গড়ে তোলা দরকার।

No comments:

Post a Comment